বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

জানা অজানা কাহিনী

আমরা আমাদের চতুর্দিকে যে অসীম বিস্তৃতি অবলোকন করি অথবা বিজ্ঞানীগণ শক্তিশালী দূরবিক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে ঊর্ধ্বাকাশে যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টিপাত করতে সক্ষম, সেই দূরত্বটুকুই কি সাত-আসমানের সীমানা, নাকি এর পরেও দৃষ্টিসীমার অন্তরালে আল্লাহতায়ালা আরও ছয়টি আসমানকে সাজিয়ে রেখেছেন ? – এই প্রশ্নটি নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই এবং এর সঠিক জবাব বিজ্ঞান এখনও পর্যন্ত দিতে পারেনি। তবে আল-কোরআনে এ বিষয়ে বেশ কিছু ইংগিত রয়েছে। বৈজ্ঞানিক ইংগিতবহ ঐশী-দিকনির্দেশনার আলোকে গবেষণাকর্ম চালিয়ে গেলে সত্যান্বেষী বিজ্ঞানীগণ অচিরেই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাবেন। এর ফলে সকল দ্বিধাদন্দের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ সত্যকে আরও নিবিড়ভাবে জানতে ও বুঝতে পারবে। যদিও আমার জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত, তথাপি এ অবধি অর্জিত যৎসামান্য জ্ঞানের আলোকে আমি এ বিষয়ে কিছু বক্তব্য পেশ করতে চেয়েছি। আসল জ্ঞান তো সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ মহান আল্লাহতায়ালার নিকটে।
মহান আল্লাহতায়ালা ‘সপ্ত-আকাশমন্ডলীকে’ আল-কোরআনে সৃষ্টি বিষয়ক আয়াতসমূহে স্পষ্টভাবে ‘ছাব`আ ছামাওয়াতি’হিসেবেই উল্লেখ করেছেন-
আল-কোরআন-
সূরা হা-মীম-আস সীজদা-আয়াত নং-১২
(৪১ : ১২) ফাক্বাদ্বা- হুন্না ছাব’আ ছামা-ওয়া-তিন ফী ইয়াওমাইনি ওয়া আওহা-ফী কুল্লি ছামা -য়িন আমারাহা; ওয়া যাইয়্যিনিছ ছামা – আদ দুনইয়া- বিমাছা- বীহা ওয়া হিফজা; জা- লিকা তাক্বদীরুল আযীযিল ‘আলীম।
(৪১ : ১২) অর্থ:- অতঃপর তিনি আকাশমন্ডলীকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তাঁর বিধান ব্যক্ত করলেন; এবং আমরা (আল্লাহ- সম্মান সূচক) দুনিয়ার অর্থাৎ পৃথিবীর (নিকটবর্তী) আকাশকে সজ্জিত করলাম প্রদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত, এটা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।
সূরা মুমিনূন-আয়াত নং-১৭
(২৩ : ১৭) অ লাক্বাদ খালাক্বনা-ফাওক্বাকুম ছাব’আ ত্বারা -য়িক্বা অমা-কুন্না-‘আনিল খালাক্বি গ্বা-ফিলীন।
[ তারা’য়িকুন =(অর্থ)- পথ, দল, পদ্ধতি -‘কোরআনের অভিধান’-মুনির উদ্দীন আহমদ -২৪০পৃষ্ঠা ] (২৩ : ১৭) অর্থ:- আমি তো তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি পদ্ধতি (পথ) এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই।
( নিকটবর্তী অর্থাৎ প্রথম আসমানে মূলত সৌরমন্ডলীয় পদ্ধতিতেই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে এবং অসীম বিস্তৃতি ঘটেছে।তেমনি বাকী আসমানগুলোতেও হয়ত ভিন্ন ভিন্ন এক একটি পদ্ধতি রয়েছে, যা আমরা এখনও জানতে পারিনি )
বিজ্ঞানের সহায়তায় আমরা জেনেছি যে, আমরা শুধুমাত্র একটি কালিক ও তিনটি স্থানিক মাত্রা দেখতে পাই এবং সেক্ষেত্রে স্থান-কাল যথেষ্ট মসৃন ( Fairly flat )। এটা প্রায় একটা কমলালেবুর বাইরের দিকটির মত। যা কাছ থেকে দেখলে সবটাই বঙ্কিম এবং কুঞ্চিত কিন্তু দূর থেকে দেখলে উঁচু নিচু দেখতে পাওয়া যায় না। মনে হয় মসৃণ। স্থান-কালের ব্যাপারটাও সেরকম -অত্যন্ত ক্ষুদ্রমাত্রায় দেখলে দশমাত্রিক এবং অত্যন্ত বঙ্কিম, কিন্তু বৃহত্তম মাত্রায় বক্রতা কিংবা অতিরিক্ত মাত্রা দেখতে পাওয়া যায় না। স্থানের তিনটি এবং কালের একটি মাত্রা ছাড়া অন্য মাত্রাগুলি বক্র হয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়তনের স্থানে রয়েছে। সেই স্থানের আয়তন প্রায় এক ইঞ্চির এক মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন, মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ। এগুলো এতই ক্ষুদ্র যে আমাদের নজরেই আসে না। সুতরাং স্পষ্টতই মনে হয়, স্থান-কালের যে সমস্ত অঞ্চলে একটি কালিক ও তিনটি স্থানিক মাত্রা কুঞ্চিত হয়ে ক্ষুদ্র হয়ে যায়নি একমাত্র সেই সমস্ত অঞ্চলেই প্রাণ অর্থাৎ প্রাণ বলতে যা বুঝি সেই রকম প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব। তবে তন্তু-ত্বত্ত্বের অনুমোদন সাপেক্ষে মহাবিশ্বের অন্যান্য এরকম অঞ্চল কিংবা এমন একাধিক মহাবিশ্ব (তার অর্থ যাই হোক না কেন) থাকার যথেষ্টই সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে সমস্ত মাত্রাই কুঞ্চনের ফলে ক্ষুদ্র কিংবা যেখানে চারটি মাত্রাই প্রায় সমতল। কিন্তু সেই সমস্ত অঞ্চলে বিভিন্ন সংখ্যক কার্যকর মাত্রাগুলো পর্যবেক্ষণ করার মত বুদ্ধিমান জীব থাকবে না। দ্বিমাত্রিক জীবের কথা কল্পণা করা যাক, যদি সে এমন কিছু খায় যে তার পুরোটা হজম করতে না পারে, তবে খাদ্যের বাকী অংশটা সে যে মুখে আহার কেরেছে সেই মুখ দিয়ে বের করে দিতে হবে। অন্যদিকে যদি দেহের ভিতরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পথ থাকে তাহলে জন্তুটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। তিনটির বেশি স্থানিক মাত্রা হলেও সমস্যা দেখা দেবে। এক্ষেত্রে দুটি বস্তুর মধ্যকার দূরত্বের বৃদ্ধির সঙ্গে মহাকর্ষীয় বলের হ্রাসপ্রাপ্তি সাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হবে। ফলে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার স্থিরত্ব হ্রাস পাবে এবং তারা হয় সর্পিল গতিতে সূর্য থেকে দূরে সরে যাবে, নয়তো সূর্যের ভিতরে গিয়ে পরবে। ( বিস্তারিত জানার জন্য ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ স্টিফেন ডব্লু হকিং-১০ অধ্যায় দেখে নিতে পারেন। )

আল-কোরআন-
সূরা যারিয়া-অয়াত নং-৪৭
(৫১ : ৪৭) আছ্ছামা আ বানাইনা-হা-বিআইদিওঁ ওয়া ইন্না -লামূছিউ-ন।
(৫১ : ৪৭) অর্থ:- আমি আকাশ নির্মাণ করেছি ক্ষমতা বা শক্তিবলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী।
(৫১:৪৭) নং আয়াতে “আছ্ছামা-আ” অর্থাৎ ‘আকাশ’ নির্মাণের সাথে শক্তি বা ক্ষমতার বিষয়টি উল্লেখ থাকায় এমন ‘একক আকাশের’ প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে আকাশে সৃষ্টির আদি পর্যায়ে বলবাহী মৌল-কণিকাগুলো ঘনিভূত শক্তিরূপে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে বিরাজমান ছিল। অতঃপর সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় একদা এর মহাসম্প্রসারন শুরু হয়।
“আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি” প্রবন্ধের -‘সৃষ্টিকালীন ১ম – ইওম বা দিন’- পড়ে নিলে বুঝতে সুবিধা হবে

সূরা আম্বিয়া-আয়াত নং-৩০
(২১ : ৩০) আ অ লাম ইয়ারাল লাজীনা কাফারূ -আন্নাছ ছামা- ওয়াতি অল আরদ্বা কা- নাতা- রাতাক্বান ফাফাতাক্বনা হুমা;অ জ্বায়ালনা মিনাল মা -য়ি কুল্লা শাইয়িন হাইয়্যিন; আফালা – ইউমিনূন।
(২১ : ৩০) অর্থ:- যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু পরিগঠন করলাম পানি হতে; তবুও কি ওরা বিশ্বাস করবে না ?
(২১:৩০) নং আয়াতে ‘আন্নাছ্ ছামা-ওয়াতি’ বলতে সৃষ্টিকালীন প্রাথমিক পর্যায়ের এমন ‘এক আকাশমন্ডলীর’ কথা বোঝান হয়েছে যখন সপ্ত-আকাশের মধ্যকার সকল স্তর ও মহা-স্তরগুলো এবং পৃথিবীও একত্রিত অবস্থায় বিরাজ করছিল।
সূরা-হা-মীম-আস-সিজদা-আয়াত নং-১১
(৪১ : ১১) ছুম্মাছতাওয়া -ইলাছ্ছামা -য়ি ওয়া হিয়া দুখা নুন ফাক্বা-লা লাহা – ওয়ালিল আরদ্বিতিয়া তাওআন আও কারহা; কা- লাতা- আতাইনা- ত্বা -য়িঈন।
{দুখানুন =(অর্থ)- ধুঁয়া -‘কোরআনের অভিধান’-মুনির উদ্দীন আহমদ -১৮৬ পৃষ্ঠা }
(৪১ : ১১) অর্থ:- অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধুম্রপুঞ্জ বিশেষ। অতঃপর তিনি তাকে (আকাশকে) ও পৃথিবীকে বললেন, “তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।” তারা বলল, ‘আমরা এলাম অনুগত হয়ে।’

(৪১:১১) নং আয়াতে ‘ইন্নাছ্ছামা-য়ি’ শব্দটির সাথে ‘দুখানুন’ অর্থাৎ ‘ধুম্রপুঞ্জের’ বিষয়ে উল্লেখ থাকায় এমন এক আকাশকে বোঝান হয়েছে ‘যা’ ডাইমেনশন বা মাত্রাগত ছকে নানা স্তর ও মহাস্তরে সাজান সপ্ত-আকাশ সৃষ্টির পূর্ববর্তী অবস্থা। এই অবস্থায় ‘আকাশ’, ধুম্রপুঞ্জ দ্বারা অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টির পরও বিদ্যমান ভরবাহী মৌল-কণিকা ও পৃথিবী থেকে বিকর্ষীত স্বয়ংসম্পূর্ণ মৌলিক পদার্থ কণিকা বা পরমাণুসমূহ দ্বারা ভরপুর ছিল। অতঃপর আল্লাহতায়ালার আদেশে একদিকে যেমন পৃথিবীর স্তরগুলো সৃষ্টি করা হয়, অপরদিকে তেমনি আকাশকে পৃথিবী থেকে পৃথক করে দিয়ে সপ্তাকাশে পরিণত করা হয়।
“আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি” প্রবন্ধের -‘সৃষ্টিকালীন ৫ম – ইওম বা দিন’- পড়ে নিলে বুঝতে সুবিধা হবে।

সূরা সাফ্ফাত-আয়াত নং-৬
(৩৭ : ০৬) ইন্না- যাইয়্যানাছ- ছামা -আদদুনইয়া-বিযীনাতিনিল কাওয়া-কিব।
(৩৭ : ০৬) অর্থ:- আমরা (আল্লাহ-সম্মান সূচক) দুনিয়া বা পৃথিবীর ( নিকটবর্তী ) আকাশকে গ্রহাদির অলংকারে সজ্জিত করেছি।
সূরা মূল্ক-আয়াত নং-৫
(৬৭ : ০৫) অ লাক্বাদ যাইয়্যান্নাছ ছামা – আদদুনইয়া – বিমাছা -বীহা ওয়া জ্বায়ালনা – হা – রুজুমাল লিশ শাইয়া – ত্বীনি ওয়া আতাদনা – লাহুম আজা- বাছ্ছাঈর।
(৬৭ : ০৫) অর্থ:- আমি দুনিয়া বা পৃথিবীর (নিকটবর্তী) আকাশকে সুশোভিত করলাম প্রদীপমালা ( নক্ষত্রপুঞ্জ বা গ্যালাক্সি ) দ্বারা এবং ওদের করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং ওদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তি।
সূরা হিযর- সূরা-আয়াত নং-১৬
(১৫ : ১৬) অ লাক্বাদ জ্বাআলনা- ফিছ্ছামা -য়ি বুরূজ্বাউঁ আমাইয়্যান্না-হা-লিন্না-জিরীন।
{বুরুজুন=(অর্থ)-তারকার ঘর- ‘কোরআনের অভিধান’ -৯৬পৃষ্ঠা — মুনির উদ্দীন আহমদ }
(‘বুরুজুনের’ বহুবচন হল ‘বুরুজ’। সাধারনত ‘ঘর’ বলতে যেমন দেয়াল ঘেরা এমন একটি স্থানকে বোঝায় যেখানে কয়েকজন মানুষ একত্রে বসবাস করতে পারে। তেমনি ‘বুরুজুন’ অর্থ ‘তারকার ঘর’ বলতে মহাকাশে সৃষ্ট এমন একটি স্থানকে বুঝানো হয়েছে যেখানে অনেকগুলো তারকা বা নক্ষত্র একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে একত্রিত অবস্থায় থাকে। সুতরাং‘বুরুজুনের’ অর্থ ‘মহাকাশের অসংখ্য নক্ষত্র সমৃদ্ধ স্তর অর্থাৎ গ্যালাক্সি’ হওয়াই স্বাভাবিক। আবার বুরুজ শব্দটি যেহেতু বহুবচন, সুতরাং এর দ্বারা ‘মহাকাশের অসংখ্য গ্যালাক্সি সমৃদ্ধ স্তর অর্থাৎ গ্যালাক্সিগুচ্ছ’ হওয়াই যুক্তিসংগত।)
(১৫ : ১৬) অর্থ:- আকাশে (প্রথম) আমি ‘বুরুজ’ অর্থাৎ ‘তারকার ঘরসমূহ বা গ্যালাক্সিসমূহ’ স্থাপন বা পরিগঠন করেছি এবং তাকে করেছি সুশোভিত দর্শকদের জন্য।
সূরা ফুরকান-আয়াত নং-৬১
(২৫ : ৬১) তাবা- রাকাল্লাজী জ্বাআলা ফিছ্ছামা -য়ি বুরুজাউঁ অ জ্বাআলা ফীহা- ছিরা- জ্বাউঁ অ ক্বামারাম মুনীরা।
(২৫ : ৬১) অর্থ:- কত মহান তিনি যিনি (প্রথম) আকাশে স্থাপন বা পরিগঠন করেছেন ‘বুরুজ’ অর্থাৎ ‘তারকার ঘরসমূহ বা গ্যালাক্সিসমূহ’ এবং তাতে স্থাপন বা পরিগঠন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও জ্যোতির্ময় চন্দ্র।
সূরা রাহমান-আয়াত নং- ৭ ও ৮
(৫৫ : ০৭) আছ্ছামা -আ রাফা‘আহা- ওয়া ওয়াদ্বা‘আল মীযা- ন,
(৫৫ : ০৮) আল্লা- তাত্বগ্বাও ফিল মীযা- ন।
(৫৫ : ০৭) অর্থ:- তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মানদন্ডে (মাত্রা বা ডাইমেনশনে),
(৫৫ : ০৮) অর্থ- যেন তোমরা ভারসাম্য লংঘন না কর।

(৩৭:৬), (৬৭:৫), (৪১:১২) নং আয়াতে ‘ছামা- আদদুনইয়া’ এবং (১৫:১৬), (২৫:৬১) নং আয়াতে ‘ফিছ্ছামা-য়ি’ বলতে‘পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশ অর্থাৎ প্রথম আকাশকেই’ বোঝানো হয়েছে এবং যেখানে চন্দ্র,, সূর্য, গ্রহসমূহ, ‘মাছাবিহা’ অর্থাৎ প্রদীপমালা বা নক্ষত্রপুঞ্জ (গ্যালাক্সি) এবং ‘বুরুজ’ অর্থাৎ তারকার ঘর বা গ্যালাক্সিসমূহ পরিগঠন করে এক একটি স্তর ও মহাস্তরে সজ্জিত করা হয়েছে। সেই সাথে (৪১:১২) নং আয়াতের প্রথম অংশে ‘ছাবআ ছামাওয়াতি’ বলতে সেই সপ্ত-আকাশের কথা বোঝান হয়েছে যেগুলোকে (৫৫:৭) ও (৫৫:৮)নং আয়াতে উল্লেখিত ’মীযা- ন’ অর্থাৎ ডাইমেনশন বা মাত্রাগত মানদন্ডের ছকে বেঁধে দেয়ার কারণে সেই সাতটি আকাশের প্রত্যেকটির স্বাতন্ত্রতার ভারসাম্য কখনই লংঘিত হয় না।
আবার সপ্ত-আকাশমন্ডলীতে যে অসংখ্য স্তর সৃষ্টি করা হয়েছে, এই তথ্যটিও কয়েকটি আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে-
সূরা মূলক-আয়াত নং-৩
(৬৭ : ০৩) লাজী খালাক্বা ছাব‘আ ছামা- ওয়া- তিন ত্বিবা- ক্বা ;
(৬৭ : ০৩) অর্থ:- যিনি সপ্ত-আকাশমন্ডলীতে স্তর সমূহ সৃষ্টি করেছেন ;
সূরা নূহ্-আয়াত নং-১
(৭১ : ১৫) আলাম তারাও কাইফা খালাক্বাল্লা-হু ছাব‘আ ছামা-ওয়া-তিন ত্বিবা-ক্বাওঁ
(৭১ : ১৫) অর্থ:- তোমরা কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ্ কিভাবে সপ্ত-আকাশমন্ডলীতে স্তর-সমূহ সৃষ্টি করেছেন ?

উপরের আয়াতগুলো থেকে সহজেই বুঝে নেয়া যায় যে, আল্লাহতায়ালা প্রথম আকাশ থেকে শুরু করে সপ্ত-আকাশের প্রত্যেকটিতেই অসংখ্য স্তর সৃষ্টি করেছেন। এক্ষেত্রে “ছাব‘আ ছামা-ওয়া-তি” অর্থাৎ সপ্ত-আকাশমন্ডলীকে কখনই অসংখ্য আকাশ হিসেবে ধরে নেয়া যায় না। উদাহরন স্বরূপ সহজ কথায় যদি বলি আমি সাতটি গ্লাস ও পেয়ালাটি বানিয়েছি। গ্লাসগুলি ও পেয়ালাটির মধ্যকার জিনিসগুলিও আমি বানিয়েছি। গ্লাসগুলি ও পেয়ালাটিতে যা যা আছে সবই আমার। এক্ষেত্রে পূর্বে প্রস্তুতকৃত যে সাতটি গ্লাস (নির্দিষ্টভাবে) এবং পেয়ালাটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা কখনও অসংখ্য গ্লাস বা পেয়ালা হয়ে যাবে না। বরং প্রস্তুতকৃত সাতটি গ্লাসের প্রতিটিতে এবং পেয়ালাটিতেও অসংখ্য জিনিস আছে, এটাই বুঝতে হবে। কারণ সাতটি গ্লাস প্রস্তুতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বার বার সাতটি গ্লাস না বলে ভাষার সৌন্দর্য রক্ষার্থে শুধু গ্লসগুলো বললেও সাতটি গ্লাসই বুঝতে হবে।
প্রথম আসমান বলতে আমরা কি বুঝবো ? সহজ কথায় পৃথিবী পৃষ্ঠের চতুর্দিকে ঊর্ধ্বে দৃশ্যমান যে অসীম বিস্তার আমরা অবলোকন করি, সেটাকেই প্রথম আসমান হিসেবে চিহ্নীত করা যেতে পারে। আমাদের পা যখন পৃথিবী পৃষ্ঠ ছুঁয়ে থাকে তখন আমাদের মাথা থাকে প্রথম আসমানের সবচেয়ে নিকটতম স্তর অর্থাৎ বায়ুমন্ডলের মধ্যে। তাছাড়া বায়ুমন্ডলের স্তরসমূহ, কক্ষপথ, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জসমূহ যেমন আমাদের ছায়াপথ অর্থাৎ Milky Way galaxy এর মত অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলো, গ্যালাক্সিগুচ্ছ বা বুরুজ অর্থাৎ ‘তারকার ঘর সমূহ’ ইত্যাদি সবকিছুই প্রথম আসমানের অসংখ্য স্তরসমূহ। প্রথম আসমানের এই দৃশ্যমান সীমানাকে আমরা কখনই অতিক্রম করতে পারব না এবং অন্যান্য আসমানসমূহে কি আছে তা হয়ত স্বচক্ষে দেখতে পারব না। তবে দৃষ্টি-সীমানার মধ্যে আবদ্ধ প্রথম আসমানী জগতের বাহিরে পরবর্তী আসমানসমূহে কি আছে তা সরাসরি দেখতে না পারলেও অদূর ভবিষ্যতে মহাশক্তি বা বিশেষ ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে অনুভবের আলোকে হয়ত কিছুটা বর্ণনা করা যেতেও পারে। যেমন এখন বিজ্ঞানীগণ মোট দশটি ডাইমেনশন বা মাত্রার কথা ব্যক্ত করছেন। তবে এর মধ্যে চারটি ডাইমেনশনের কারণেই যে এই দৃশ্যমান জগতের জড় ও অজড় সবকিছু এবং আমরা আকৃতি লাভ করেছি এবং জন্ম-মৃত্যু, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, সৃষ্টি, ক্ষয়, ধ্বংস, রোগ-ব্যাধি, সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদির ছকে বাঁধা পরেছি, তা আজ প্রতিষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য। স্থানের তিনটি ও কালের একটি মাত্রা অর্থাৎ এই চারটি মাত্রার ছকে সাজান সুরক্ষিত সীমানার মধ্যে যে দৃশ্যমান জগতকে আমরা ও বিজ্ঞানীগণ শক্তিশালী দূরবিক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে অবলোকন করেন তা কি অতিক্রম করা আদৌ সম্ভব হবে ? বিজ্ঞানীগণ বাকি যে ডাইমেনশনগুলো নিয়ে অনুভব ও চিন্তা ভাবনা করছেন সেগুলো অথবা আরও অধিক ( দশ মাত্রা বা তারও অধিক ) মাত্রার ছকেই হয়ত আল্লাহতায়ালা বাকী ছয়টি আসমানকে সাজিয়ে রেখেছেন। মহাশক্তি অর্জন অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে হয়ত অচিরেই অনুমান ও অনুভবের উপর ভিত্তি করে সেই ছয়টি আসমান সম্পর্কে কিঞ্চিত ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব হতেও পারে। তবে সেই ছয়টি আকাশ আমাদের দৃশ্যপটের আড়ালেই বিরাজ করবে। দৃষ্টিসীমার মধ্যে আনা মানুষের সাধ্যের অতীত বৈকি।
সূরা নাবা-আয়াত নং-১২
(৭৮ : ১২) অর্থ:- আমি নির্মান করেছি তোমাদের ঊর্ধ্বদেশে সুস্থিত সপ্ত-স্তর,
সবশেষে বলা দরকার যে, সপ্ত-আকাশমন্ডলীকে অস্বীকার করলে অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার স্বঘোষিত সাত আসমানকে অসংখ্য আসমান হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পরোক্ষভাবে সর্বশেষ নবী ও রাসূলাল্লাহ্ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক বর্ণীত বিজ্ঞানময় মিরাজের বাস্তব ঘটনাটিকে অস্বীকার করা হয় না কি ? মিরাজের গৌরবময় রজনীতে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর অসীম ক্ষমতা ও কুদরতের পরশে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও আনুগত্যশীল বান্দা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে স্থান ও কালের সীমানা অতিক্রম করিয়ে সপ্ত-আকাশমন্ডলীতে স্ব-শরীরে ভ্রমন করিয়েছিলেন এবং অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের জ্ঞানদান করেছিলেন। সুতরাং আল্লাহর বাণী ছাব‘আ ছমাওয়াতি অর্থাৎ সপ্ত-আকাশমন্ডলীকে, অসংখ্য আকাশমন্ডলী হিসেবে ব্যাখ্যা না করে বরং আসুন আমরা নির্দিধায় মেনে নেই যে আল্লাহতায়ালা (৭৮:১২) সুস্থিত সপ্ত-আকাশকে সাতটি আসমানী সীমানার (আমাদের দৃষ্টিতে যা অসীম) অন্তরালে মজবুতভাবে নির্মান করে সাজিয়ে রেখেছেন এবং প্রত্যেকটি আকাশে অসংখ্য স্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন। বর্তমান সময়ে হয়ত এই বিষয়টিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে তেমন জোরালো ও নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের আরও উন্নততর আবিস্কারের আলোকে হয়ত এ বিষয়টিকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হবে। আল-কোরআনের অকাট্য সত্যবাণী দিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যসমূহকে যাচাই করার মানসিকতা নিয়েই ধৈর্য্যরে সাথে এই প্রচেষ্ঠা চালাতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা সকল প্রকার বিভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা পাব। কারণ আল-কোরআনের চরম সত্য তথ্যগুলোর মোকাবেলায় অনুমানের কোনই মূল্য নাই।

বিংশ শতাব্দি বিজ্ঞানের যুগ। প্রায় ১৪৫০ বছর পূর্বেই মহান স্রষ্টা তাঁর বিজ্ঞানময় গ্রন্থে এমন সব অকাট্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের অবতারনা করেছেন যেগুলোর মর্ম ধীরে ধীরে উপলব্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। এ বিষয়টি তো সর্বজ্ঞ আল্লাহতায়ালার পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল এবং তিনি ভালভাবেই জানতেন যে, এমন এক সময় আসবে যখন আল-কোরআনে প্রদত্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো অন্যান্য ধর্মের বিজ্ঞানীদের দ্বারা তাদের অজান্তেই সত্য বলে আবিষ্কৃত হতে থাকবে। এরফলে এই সত্য তথা প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো একদিকে যেমন তারা সরাসরি অস্বীকার করতে পারবে না, অপরদিকে তেমনি এই তথ্যগুলো কিভাবে আল-কোরআনে স্থান পেল তা অবিশ্বাসীরা ভেবে কুল পাবেনা। কিন্তু এই সত্য তথ্যগুলোকে যে স্বয়ং মহান স্রষ্টাই তাঁর প্রেরিত মহাগ্রন্থে মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য আগে থেকেই সংযোজন করে রেখেছেন তা ঈমানদারেরা সহজেই বুঝে নেবে ও একবাক্যে বিশ্বাস করে নেবে। এই ঐশী তথ্যগুলোর অছিলায় অনেক নীরহংকার জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যাক্তিবর্গ যে ইমানের আলোয় আলোকিত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তবে এপরও যারা অহংকার বশত বে-ইমানের পথে পা বাড়াবে তাদের ফায়সালার জন্য তো মহান আল্লাহই যথেষ্ট।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 comments: